সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:১১ অপরাহ্ন
অনলাইন ডেস্ক, একুশের কণ্ঠ:: বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুরহস্য তদন্তে নতুন তথ্য পেয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তার বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের রিমান্ডে দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী, মৃত্যুর রাতে উত্তরার একটি বারে মদ্যপানের পর হেরোইন খুঁজতে টঙ্গীর একটি মাঠে যান তাহসিফ। সেখানে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে দীপ পালিয়ে গেলেও তাহসিফের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয় তাহসিফের মরদেহ।
তবে তাহসিফ কীভাবে নদে পড়ে মারা গেছেন, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্তকারীরা। প্রাথমিকভাবে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ধারণা করা হলেও হত্যার অভিযোগসহ সব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৮ মিনিটে তাহসিফ, তার বান্ধবী জারিকা তাসনিম দিশা ও বন্ধু দীপ উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের নেস্ট বারে যান। কয়েক দিন আগে দিশার অন্য এক যুবকের সঙ্গে ইয়াবা সেবন ও শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পেরে মনঃকষ্টে ছিলেন তাহসিফ। এ নিয়ে বারে তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটিও হয়।
দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, বারে গিয়ে তাহসিফ বিষণ্ন সংগীত বাজানোর অনুরোধ করেন। পরে তিনজন মদ্যপান করেন। রাত ১২টার দিকে দিশার সঙ্গে অন্য যুবকের সম্পর্ক নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে তাহসিফ বলেন, তুমি তো ইয়াবা খেয়েছ, আমি এর চেয়েও বড় কিছু খাব। আমি হেরোইন খাব।
টঙ্গীর মাঠে গিয়ে হেরোইন সেবন
রাত ১২টার দিকে বার থেকে বেরিয়ে তাহসিফ দিশাকে উত্তরার বাসায় পৌঁছে দেন। দীপও সেখানে যান। পরে দুজন মোটরসাইকেলে টঙ্গী বাজার বস্তি-সংলগ্ন একটি মাঠে রওনা হন। দীপের দাবি, সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল তাহসিফের।
মাঠের পাশে মোটরসাইকেল রেখে তারা ভেতরে যান। সেখানে স্থানীয় মাদকসেবী ও কারবারিদের উপস্থিতিতে তাহসিফ উচ্চস্বরে হেরোইন চান এবং যত টাকা লাগে দিতে রাজি হন। পরে কয়েকজনের কাছ থেকে হেরোইন কিনে সেবন করেন তিনি।
দীপের দাবি, মদ্যপানের পর হেরোইন সেবনে তাহসিফ নিজের ওপর অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন। এমন সময় সেখানে পুলিশের একটি টহল দল আসে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে স্থানীয় মাদক কারবারিরা পালিয়ে যান। দীপও দৌড়ে নদীর পাড়ের দিকে গিয়ে ২৯ নম্বর পিলারের পেছনে আত্মগোপন করেন। এ সময় তাহসিফের সঙ্গে তার বিচ্ছিন্নতা ঘটে।
দীপ জানান, দুই থেকে তিন মিনিট পর দুই পুলিশ সদস্য তাকে ঘিরে ধরেন। পরিচয় জানতে চাইলে তিনি নিজেকে ক্যাপ্টেন তাহসিফের বন্ধু বলে পরিচয় দেন। বাসা মোহাম্মদপুরে জানালে এত রাতে সেখানে আসার কারণ জানতে চান পুলিশ সদস্যরা। দীপ তাদের বলেন, একটি কাজে এসেছেন। পরে পুলিশ তাকে চলে যেতে বললেও তিনি বস্তির ভেতরের সরু রাস্তা দিয়ে চলে যান।
একাধিকবার ফোন করেও পাননি সাড়া
পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে নিজেকে তাহসিফের বন্ধু ও বাহিনীর ক্যাপ্টেনের পরিচিত হিসেবে তুলে ধরেছিলেন বলে দাবি করেন দীপ। বস্তির ভেতরে রাস্তা চিনতে না পেরে এক মাদকসেবীর সহায়তায় মূল সড়কে ফিরে আসেন তিনি। পরে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে তাহসিফকে একাধিকবার ফোন করেন। কিন্তু প্রতিবারই ফোন বন্ধ পান।
দীপের ধারণা ছিল, তাহসিফ হেরোইন সেবন করতে এসেছেন, তাই মাদক না নিয়ে চলে যাবেন না। এ ছাড়া তাহসিফ তার কাছ থেকে ফোন চার্জ দেওয়ার জন্য একটি পাওয়ার ব্যাংক নিয়েছিলেন। সে কারণে ফোনের চার্জ শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে বলেও মনে করেছিলেন তিনি। পরে মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন। তবে তাহসিফকে নদে পড়ে যেতে বা পানিতে ডুবে যেতে দেখেননি বলে দাবি করেছেন দীপ।
প্রাথমিক তদন্তে দুর্ঘটনার ধারণা
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, দীপকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে এবং তার দেওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। তাহসিফের মরদেহে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। বারের ঘটনাসহ মোবাইল ফোনের তথ্য ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে হত্যাকাণ্ডের চেয়ে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সম্ভাবনাই বেশি মনে হচ্ছে।
পুলিশের উপস্থিতিতে পালানোর সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাহসিফ পানিতে পড়ে যেতে পারেন বলে ধারণা করছেন তদন্তকারীরা। তবে এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
ওই কর্মকর্তা বলেন, দীপের বক্তব্য আরও যাচাই করা প্রয়োজন। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং রাসায়নিক পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে। তাহসিফ মাদক সেবন করেছিলেন কি না, কিংবা তার শরীরে কোনো বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না, পরীক্ষার মাধ্যমে সেটিও জানা যেতে পারে।
মাঠে যাওয়ার ভিডিও পুলিশের হাতে
তাহসিফ ও দীপের টঙ্গী বাজার বস্তি-সংলগ্ন মাঠে যাওয়ার একটি ভিডিও তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। ভিডিওতে তাহসিফকে বস্তির সরু রাস্তা দিয়ে মাঠের দিকে যেতে দেখা যায়। তার পেছনে হাতে হেলমেট নিয়ে যাচ্ছিলেন দীপ। এ সময় তাহসিফকে বলতে শোনা যায়, ‘দীপ, ডোন্ট টক টু মাচ, লেটস ওয়াক।’
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ সূত্র জানায়, ময়নাতদন্তের সময় তাহসিফের পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ভিসেরা ও রক্তের নমুনাও পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও নমুনা সংগ্রহ করেছে পুলিশ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফরেনসিক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, মরদেহটি আনুমানিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পানির নিচে ছিল। প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ছাড়া নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। তাহসিফের সাঁতার জানার বিষয়টিও বিবেচনায় রেখে তিনি কী পরিস্থিতিতে পানিতে পড়েছিলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
যেভাবে উদ্ধার হয় তাহসিফের মরদেহ
গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় উত্তরার বাসা থেকে বন্ধু দীপের ডাকে বের হন বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি (২৮)। ওই রাতে মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলে বাসায় ফেরার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আর ফেরেননি। রাত ১টার দিকে তাহসিফের ফোন থেকে মায়ের মেসেঞ্জারে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, ‘রওনা দিসি আসতেছি’।
পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে চারটার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসার খবর আসে। পরে টঙ্গী নৌপুলিশ রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে মরদেহ উদ্ধার করে। পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত হয়। সুরতহাল প্রতিবেদনে শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে জানায় পুলিশ।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত শুরু করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ২৯ অক্টোবর গভীর রাতে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
প্রথমদিকে দীপ দাবি করেছিলেন, একটি রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খেয়ে উত্তরার হাউজ বিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান তিনি। পরে জিজ্ঞাসাবাদে টঙ্গীর মাদক স্পটে যাওয়ার কথা জানান।
ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় শুরুতে মামলা করতে অনীহা প্রকাশ করলেও ৩০ অক্টোবর দিবাগত রাতে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
পরে দীপকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠায় নৌপুলিশ। ৩১ অক্টোবর ঢাকা মহানগর হাকিম আদালত পুলিশের সাত দিনের রিমান্ড আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
অন্যদিকে, রোববার (১ নভেম্বর) তাহসিফের সঙ্গে ঘটনার রাতে নেস্ট বারে যাওয়া জারিকা তাসনিম দিশাকে কাফরুলের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে নৌপুলিশ। তারও সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।
তদন্তকারীরা জানান, সিসিটিভি ফুটেজ ও তাহসিফের ফোনের কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দিশার সঙ্গে তার যোগাযোগ এবং ঘটনার রাতে একসঙ্গে বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। দীপ ও দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদ, ময়নাতদন্ত এবং রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পরই তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।